তারাবির নামাজ: গুরুত্ব, দলিল ও বিধান

 


রমজান মাস মুসলমানদের জন্য রহমত, বরকত মাগফিরাতের মাস। মাসে রোজার পাশাপাশি একটি বিশেষ ইবাদত হলো তারাবির নামাজ অনেকের মনে প্রশ্ন জাগেতারাবির নামাজ কি ওয়াজিব, সুন্নত না নফল? রাকাত না ২০ রাকাত? যদি কেউ না পড়ে, তবে কি গুনাহ হবে? আজকের আলোচনায় আমরা কুরআন, হাদিস ইসলামি ফিকহের আলোকে এসব বিষয়ে বিস্তারিত জানব।

আরোও পড়ুনঃ সূরা ফাতিহা ও  সুরা কাফিরুন হতে সুরা নাস বাংলা অর্থসহ উচ্চরণ ।

তারাবির নামাজ কী?

তারাবি হলো রমজান মাসে এশার নামাজের পর জামাত সহকারে বা একাকী আদায় করা বিশেষ নফল নামাজ।তারাবিহশব্দের অর্থ হলো বিশ্রাম বা বিরতি, কারণ সাহাবায়ে কেরাম নামাজ লম্বা লম্বা কিয়ামসহ পড়তেন এবং কয়েক রাকাত পর পর বিশ্রাম নিতেন।

 

তারাবির নামাজ কি ওয়াজিব?

না, তারাবির নামাজ ওয়াজিব নয় ইসলামে ওয়াজিব মানে হলো বাধ্যতামূলক ইবাদত, যা না করলে গুনাহ হয় এবং কাযা করতে হয়। তারাবি ওয়াজিব নয়, তাই না পড়লে কাযা নেই। তবে হাদিসের প্রমাণ অনুযায়ী, এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত।

 

তারাবির নামাজ কি নফল?

হ্যাঁ, মূলত তারাবির নামাজ নফল ইবাদতের অন্তর্ভুক্ত তবে অন্যান্য সাধারণ নফল নামাজের তুলনায় তারাবির স্থান অনেক উঁচু। কারণ, এটি রমজান মাসের একটি বিশেষ আমল এবং নবী করিমএর নিয়মিত আদায়কৃত ইবাদত।

 

তারাবির নামাজ কি সুন্নত?

হ্যাঁ, তারাবি হলো সুন্নতে মুয়াক্কাদা অর্থাৎ এমন একটি সুন্নত, যা নবী করিমনিয়মিত আদায় করেছেন এবং সাহাবায়ে কেরামকে তা আদায় করতে উৎসাহিত করেছেন। তাই মুসলমানদের জন্য এই নামাজ পড়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

 

তারাবির নামাজ কি সুন্নতে মুয়াক্কাদা?

উলামায়ে কেরাম সর্বসম্মতভাবে বলেছেন যে, তারাবি হলো সুন্নতে মুয়াক্কাদা যেমন ফরজ নামাজের আগে-পরে নির্দিষ্ট সুন্নত আছে, ঠিক তেমনি রমজানের মাসে তারাবি নামাজ একটি জোরালো সুন্নত।

 

তারাবির নামাজ রাকাত না ২০ রাকাত?

এখানেই সবচেয়ে বেশি আলোচনা হয়।

  • হাদিসে প্রমাণ: সহিহ বুখারি সহিহ মুসলিমে আছে, হযরত আয়েশা (রা.) বলেছেন – “রাসূলুল্লাহরমজান হোক বা রমজানের বাইরে, ১১ রাকাতের বেশি নামাজ পড়তেন না।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১১৪৭)
    এখানে রাতের নামাজ (কিয়ামুল লাইল/তারাবি) রাকাত রাকাত বিতর বোঝানো হয়েছে।
  • খলিফা উমর (রা.) এর আমল: হযরত উমর (রা.) তাঁর খিলাফতের সময়ে মুসলমানদেরকে ২০ রাকাত তারাবি নামাজে একত্র করেছিলেন এটি জামাতের রূপ পায় এবং পরবর্তী যুগে উলামারা ২০ রাকাতকে সুন্নতে মুয়াক্কাদা হিসেবে গ্রহণ করেন।

 তাই, রাকাত পড়া হাদিসের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ, আবার ২০ রাকাত পড়া সাহাবাদের সর্বসম্মত আমল। উভয় ক্ষেত্রেই সওয়াব আছে।

 

তারাবির নামাজ কি বাধ্যতামূলক?

না, এটি বাধ্যতামূলক নয়। তবে গুরুত্বপূর্ণ সুন্নত হওয়ার কারণে এর নিয়মিত আদায় মুসলমানের ঈমানি জীবনে বড় পুরস্কারের কারণ।

 

তারাবির নামাজ না পড়লে কি গুনাহ হবে?

যেহেতু এটি ফরজ বা ওয়াজিব নয়, তাই না পড়লে ফরজের মতো গুনাহ হবে না। তবে যেহেতু এটি সুন্নতে মুয়াক্কাদা, তাই অযথা অবহেলা করলে আল্লাহর নিকট দোষী গণ্য হতে পারে এবং বিরাট সওয়াব থেকে বঞ্চিত হবে।

 

তারাবির নামাজের নিয়ত

তারাবির নিয়ত অন্য নামাজের মতোই সহজ। তারাবির নামেয়ের বিশেষ কোন নিয়াত নেই। মুখে উচ্চারণের চাইতে মনে মনে নিয়াত বা সংকল্প করা ভাল।

বাংলা নিয়ত: (নিয়ত হবে মনে মনে)
আমি তারাবির দুই রাকাত সুন্নতের নামাজ আদায় করার নিয়ত করলাম আল্লাহর জন্য, ইমামের অনুসরণে।

একাকী পড়লে শুধু "ইমামের অনুসরণে" অংশ বাদ দিতে হবে।

 

তারাবির নামাজের গুরুত্ব ফজিলত

. রাসূলুল্লাহবলেছেন:
যে ব্যক্তি ঈমান সওয়াবের আশায় রমজানের কিয়াম (তারাবি) আদায় করবে, তার পূর্বেকার সব গুনাহ মাফ করে দেওয়া হবে।
(
সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম)

. এটি রমজানের রাতগুলোকে জীবন্ত করে তোলে এবং আল্লাহর নৈকট্য বাড়ায়।

. তারাবিতে কুরআন তেলাওয়াত শোনা হয়, যার মাধ্যমে পুরো রমজানে একবার খতম করা অনেক স্থানে প্রচলিত।

 

সারসংক্ষেপ

  • তারাবির নামাজ ওয়াজিব নয়, তবে সুন্নতে মুয়াক্কাদা
  • এটি মূলত নফল ইবাদত, কিন্তু সাধারণ নফলের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বসম্পন্ন।
  • রাকাত সংখ্যা নিয়ে ২০উভয় মতই বিদ্যমান।
  • না পড়লে ফরজের মতো গুনাহ নেই, তবে অবহেলা করা উচিত নয়।
  • নিয়ত সহজভাবে করা যায়, আরবি বা বাংলায়। (নিয়ত হবে মনে মনে)

 

শেষকথা

রমজানের এই বরকতময় মাসে তারাবির নামাজের মাধ্যমে আমরা আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করতে পারি। এটি কোনো কঠিন ইবাদত নয়, বরং আত্মাকে পরিশুদ্ধ করার একটি মাধ্যম। তাই আসুন, তারাবির নামাজকে গুরুত্ব দিয়ে নিয়মিত আদায় করি এবং আল্লাহর অশেষ রহমত অর্জনের চেষ্টা করি।

Post a Comment (0)
Previous Post Next Post